মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা নিরাময়

মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো একটি বহুল বিস্তৃত সমস্যা । এই সমস্যার সম্মুখীন না হয়ে মরিচ ফলাতে পেরেছে এমন বাগানি খুঁজে পাওয়া যাবে না । আবার এই পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা অনেক গুলো কারণে হয়ে থাকে , তাই প্রথমে সঠিক কারণ নির্ণয় করতে হয় । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাতা কুঁকড়ানো সমস্যার সমাধানে নানান ঘরোয়া পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। এসবের বেশিরভাগই অসত্য ও অকার্যকর । তাই, এখানে শুধু মাত্র কার্যকর দমন ব্যবস্থা গুলো তুলে ধরা হয়েছে ।  

সূচিপত্র – 

  • পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার কারণগুলো 
  • সমস্যার কারণ নির্ণয় ও প্রতিকার 

      ১. মাকড় নির্ণয় ও প্রতিকার

      ২. থ্রিপস বা চুষি পোকা নির্ণয় ও প্রতিকার

      ৩. এফিড বা জাব পোকা নির্ণয় ও প্রতিকার

      ৪. সাদা মাছি নির্ণয় ও প্রতিকার

      ৫. ভাইরাস নির্ণয় ও প্রতিকার 

  • পাতা কুঁকড়ানো সমস্যার কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা  
  • কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর-(FAQ)    

পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার কারণগুলো:

মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো রোগ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। তাই প্রথমে, যে কারণে পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা হয়েছে তা নির্ণয় করতে হবে। তারপর সেই অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেসব কারণে পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে – 

  • লাল বা হলুদ মাকড় 
  • থ্রিপস বা চুষি পোকা 
  • এফিড বা জাব পোকা 
  • সাদা মাছি (White filies )
  • লিফ কার্ল ভাইরাস 

সাধারণত এগুলোর আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে যায়। তবে, অনেক সময় খাদ্য ঘাটতি, অনিয়মিত সেচ প্রদানের কারণেও মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা হতে পারে। 

সমস্যার কারণ নির্ণয় ও প্রতিকার: 

১.মাকড় নির্ণয় 

মরিচে দুই ধরনের মাকড়ের আক্রমণ ঘটে,  লাল ও হলুদ । মাকড় পাতার উল্টো পাশে অবস্থান করে রস চুষে খায় এবং মাকড় খালি চোখে দেখা যায় না ।

রস চুষে খাওয়ার এক পর্যায়ে পাতা উল্টো নৌকার মতো বেঁকে যায় অর্থাৎ পাতা নিচের দিকে কুঁকড়িয়ে যায় । শেষে পাতা একদম শুকিয়ে , ঝড়ে পরে । 

১.১ প্রতিকার : 

  • নিম তেল – আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে নিম তেল ব্যবহার সুফল পাওয়া যায় ।‌ প্রত্যেক সপ্তাহে নিয়মিত ভাবে নিম তেল প্রয়োগ করতে হবে । তবে , আক্রমণ প্রকট হলে নিম তেলে খুব একটা কাজ হয় না । 
  • সাবান পানি বা ডিটারজেন্ট পানি – মাকড় এসব সাবান পানি বা লিকুইড ডিস সাবান পানির প্রয়োগে প্রতিরোধ হয় না । এসব প্রয়োগ কোন কাজে আসে না । 
  • রাসায়নিক কীটনাশক-  কীটনাশক ব্যবহারে আক্রান্ত পাতা ঠিক না হলেও মাকড় দমন হয় । নতুন করে আর মাকড় আক্রমণ দেখা যায় না । মাকড়নাশক কার্যকরী ভাবে মাকড় দমন করতে পারে ।‌

  • মাকড়নাশক – ইন্ট্রাপিড ( ক্লোরফেনাপাইর ) একই সাথে মাকড়নাশক এবং থ্রিপস , জাব পোকাও দমন করে । 

এবামেকটিন গ্রুপের মাকড়নাশক কার্যকরী ভাবে মাকড় দমন করে ।‌

সালফার জাতীয় মাকড়নাশক থিওভিট (৮০% সালফার ) কার্যকরী ভাবে মাকড় দমন করে । এটা প্রয়োগে আবার আর একটা উপকার হয় তা হলো গাছের সালফার ঘাটতি পূরণ হয় । 

এসব কীটনাশক বাংলাদেশ ও ভারতে উভয় দেশেই একই নামে পাওয়া যায়। 

২. থ্রিপস বা চুষি পোকা নির্ণয় 
এই পোকা পাতার উপরের অংশ থেকে রস চুষে খায় । এজন্য এর আক্রমণে পাতা নৌকার মতো অর্থাৎ উপরের দিকে বেঁকে যায় । পাতার মধ্য শিরার আশেপাশে বাদামি রং দেখা যায় , পাতা শুকিয়ে যায় , পাতার অনেক বিকৃতি ঘটে । এই পোকাও মাকড়ের মতো খালি চোখে দেখা যায় না । 

২.১ প্রতিকার: 

  • নিম তেল-  আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে যখন আক্রমণের মাত্রা কম থাকে তখন নিম তেল এ আক্রমণ দমন করা যায় । এর জন্য নিয়মিত প্রত্যেক সপ্তাহে নিম তেল প্রয়োগ করতে হবে । আক্রমণ বেশি হলে নিম তেলে খুব একটা কাজ হয় না । 
  • সাবান পানি বা ডিটারজেন্ট পানি-  এসবে থ্রিপস দমন হয় না ।
  • রাসায়নিক কীটনাশক-  কীটনাশক প্রয়োগে ১০০% কার্যকরী ভাবে থ্রিপস দমন করা যায় । 

ইমিডাক্লোপিড গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগে থ্রিপস দমন হয় । 

এই কীটনাশক বাংলাদেশ ও ভারতে উভয় দেশেই পাওয়া যায় । 

৩. এফিড বা জাব পোকা নির্ণয়

পাতা থেকে রস চুষে খায় এবং কান্ডেও আক্রমণ করে । আক্রমণের এক পর্যায়ে পাতা -কান্ড হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায়। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় । এই পোকার আক্রমণেও মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা হতে পারে । এই পোকা মূলত মরিচ এর পাতা কুঁকড়ানো ভাইরাস (chilli leaf curl virus) বহন করে এবং এক গাছ থেকে আরেক গাছে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয় ‌। 

৩.১ প্রতিকার : 

  • নিম তেল–  নিম তেল স্প্রে করলে এই পোকা দমন হয় । এর জন্য নিয়মিত নিম তেল প্রয়োগ এর প্রয়োজন পরে । তবে নিম তেল সম্পূর্ণ রুপে জাব পোকা দমন করতে পারে না। 
  • সাবান বা ডিটারজেন্ট পানি-   এক লিটার পানিতে এক টেবিল চামচ লিকুইড সাবান মিশিয়ে গাছে স্প্রে করলে জাব পোকার আক্রমণ কিছুটা দমন হয় । এর জন্য প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করে স্প্রে করতে হবে । তবে, এটা কোন কার্যকর পদ্ধতি নয় ।  
  • রাসায়নিক কীটনাশক-    আক্রমণ বেশি হলে এবং সম্পূর্ণ রুপে পোকা দমন করতে চাইলে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে । 

ম্যালাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারে এই পোকা দমন হয় । তবে ইমিডাক্লোপিড গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগে ১০০% কার্যকরী ভাবে পোকা দমন হয় (পরিক্ষীত) । 

৪. সাদা মাছি ( White filies) নির্ণয়

 ছোট হলুদ বর্ণের পোকা গাছের পাতার নিচে বসে থেকে রস চুষে খায়। পূর্ণাঙ্গ পোকাতে সাদা রং এর ডানা থাকে যা দেখে সহজেই এই পোকা সনাক্ত করা যায় । পোকা ঘন মোমের মতো গুঁড়া দিয়ে ঢাকা থাকে ।‌‌

এই পোকা মূলত মরিচ এর পাতা কুঁকড়ানো ভাইরাস (chilli leaf curl virus) বহন করে এবং এক গাছ থেকে আরেক গাছে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয় ‌। যার ফলে পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা দেখা দেয়।

৪.১ প্রতিকার : 

  • নিম তেল–  নিম তেল প্রয়োগে এই পোকা দমন হয় ।
  • আক্রমণের প্রথম অবস্থায় নিম তেল প্রয়োগ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় ।
  • সাবান বা ডিটারজেন্ট পানি-  এক লিটার পানিতে এক টেবিল চামচ লিকুইড সাবান পানি মিশিয়ে আক্রান্ত স্থানে সজোরে স্প্রে করতে হবে। সপ্তাহে এক থেকে দুই বার করে স্প্রে করতে হবে। এতে পোকা  সম্পূর্ণ দমন না হলেও কিছুটা উপকার হবে । 
  • রাসায়নিক কীটনাশক-  ইমিডাক্লোপিড গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগে ১০০% কার্যকরী ভাবে এই পোকা দমন করা যায় । 

৫. ভাইরাস নির্ণয় 

ভাইরাস এর আক্রমণে মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো সমস্যা হতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে প্রথমেই ভাইরাস আক্রমণ করে না। জাব পোকা , সাদা মাছি এই পোকা গুলো দীর্ঘ সময় ধরে গাছে আক্রমণ করলে অর্থাৎ সময়মত এসব পোকার প্রতিকার না করলে ভাইরাস এর আক্রমণ ঘটে । মানে, সাদা মাছি,জাব পোকা ভাইরাস এর বাহক হিসেবে কাজ করে এক গাছ থেকে আর এক গাছে ভাইরাস ছড়ায় ।  ভাইরাস এর কারণে পাতা নৌকার মতো অর্থাৎ উপরের দিকে বেঁকে যায় এবং পাতায় সবুজ -হলুদ দাগের মিশ্রণ দেখা যায় । প্রথম অবস্থায় ভাইরাস এর আক্রমণ কিনা তা বুঝতে না পারলে জাব পোকা আর যদি সাদা মাছি থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে ।

প্রতিকারের পরও যদি পাতা কুঁকড়ানো ঠিক না হয় তাহলে বুঝতে হবে এটা ভাইরাস এর আক্রমণ।

৫.১  প্রতিকার :  

ভাইরাস এর জন্য কোন প্রতিকার বা প্রতিষেধক ব্যবস্থা নেই ।

এই অবস্থায় আক্রান্ত গাছ তুলে মাটিতে গর্ত করে চাপা দিতে হবে বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে । এতে করে ভাইরাস নতুন করে ছড়িয়ে পরতে পারবে না । 

পাতা কুঁকড়ানো রোগের কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা: 

– চারা করার জন্য রোগ- পোকা বিহীন সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। 

– আগাছা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।

– কোন গাছে পাতা কুঁকড়ানো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে তা অন্য গাছ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে ।

– সপ্তাহে একবার করে নিম তেল স্প্রে করলে পোকা সহজে আক্রমণ করতে পারে না । 

হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহারঃ

সাদা মাছি,এফিড-জাব পোকা , থ্রিপস এসব পোকার জন্য হলুদ বা সবুজ রং এর আঠালো ফাঁদ পাওয়া যায় । এসব ফাঁদ দ্বারা পোকা আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদের আঠায় আটকে যায় । 

এটি ১০০% পরিবেশ বান্ধব জৈব পোকা দমন পদ্ধতি।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর -(FAQ)  

১. নিম তেল কত টুকু পানিতে কত টুকু মেশাতে হবে? 

উত্তর – এই সম্পর্কিত নির্দেশনা নিম তেল এর প্যাকেট বা বোতলের গায়ে লেখা থাকে ।

২. কীটনাশক এর প্রয়োগ মাত্রা কত টুকু? 

উত্তর – এ সম্পর্কিত নির্দেশনা প্যাকেট বা বোতলের গায়ে লেখা থাকে । 

৩. কোন পোকার আক্রমণ হয়েছে তা যদি সনাক্ত করা না যায় তাহলে কি করতে হবে? 

উত্তর – ইন্ট্রাপিড ( ক্লোরফেনাপাইর ) একই সাথে মাকড়নাশক এবং থ্রিপস ,সাদা মাছি, জাব পোকাও দমন করে । এই কীটনাশক প্রয়োগ করলে পাতা কুঁকড়ানো ভালো হয়ে যাবে ।

বা প্রথমে এবামেকটিন গ্রুপের মাকড়নাশক প্রয়োগ করে ২-৩  দিন পর ইমিডাক্লোপিড গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এতেও মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো রোগ ভালো হবে । 

৪. এই রোগের আক্রমণে গাছ মারা যায়? 

উত্তর – আক্রমণ বেশি মাত্রায় হলে এবং গাছ অনেক ছোট থাকলে গাছ মারা যেতে পারে। 

৫. রোগের আক্রমণে কোন রকম প্রতিকার ব্যবস্থা না নিলে কি হবে ? 

উত্তর – যদি ভাইরাস এর আক্রমণ না হয় তাহলে, গাছের অধিকাংশ পাতা কুঁকড়িয়ে ঝরে যাবে , কান্ডের মাথার অংশ ঝরে যাবে, গাছ এর বৃদ্ধি কমে খাটো হয়ে যাবে ।‌ এর পরে গাছের জীবনীশক্তি প্রকট হলে পুনরায় নতুন পাতা – কান্ড জন্ম নিবে এবং এই নতুন পাতা-কান্ডে কুঁকড়ানো ভাব নাও‌ থাকতে পারে। 

পরিশেষে, মরিচ গাছের পাতা কুঁকড়ানো সমস্যার জন্য আমাদের প্রথমে গাছ পর্যবেক্ষণ করে সমস্যার কারণ নির্ণয় করতে হবে ।‌ তারপর সে অনুযায়ী দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে, এক্ষেত্রে প্রথমেই কীটনাশক প্রয়োগ না করে জৈব উপায়ে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে যদি সমস্যা ভালো হয় তাহলে সব দিক থেকেই ভালো। সাধারণত যারা অল্প পরিসরে কয়েকটা গাছ লাগিয়ে বাগান করে তাদের গাছে রোগ-পোকা আক্রমণ বেশি হয় ‌।

Leave a Reply