জায়ান্ট মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা প্রত্যেক বাগানি/কৃষক এর অতি পরিচিত একটি কীট । মিলিবাগ দমন এর বিভিন্ন ১০০% কার্যকর পদ্ধতি ও আংশিক কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে । তবে স্থায়ীভাবে দূর করতে চাইলে দমনের পাশাপাশি প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে । এখানে দমন পদ্ধতি গুলোর তুলনামূলক আলোচনার পাশাপাশি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কেও বলা হয়েছে।
সূচিপত্র –
- জায়ান্ট মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা কি ?
- মিলিবাগ দমন পদ্ধতি গুলো
১. হাত সাফাই – (১০০% পরিবেশ বান্ধব)
২. তুলোতে বা ব্রাশে রাবিং অ্যালকোহল নিয়ে
৩. লিকুইড সাবান ও পানি প্রয়োগ
৪. নিম তেল প্রয়োগ
৫. কীটনাশক প্রয়োগ
- কিছু পূর্ববর্তী কাজ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা
- কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর -(FAQ)
জায়ান্ট মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা কি ?
মিলিবাগ এক ধরনের স্কেল ইনসেক্ট । পোকার আক্রমণে পাতা , ফল ও ডালে সাদা সাদা গুটি বা তুলার মতো দেখা যায়। এগুলো গাছের কচি পাতা-কান্ড , ফল থেকে রস চুষে খায় । এর ফলে পাতা-কান্ড দুর্বল হয়ে পরে।
মিলিবাগের সাথে সাথে আক্রান্ত গাছে পিঁপড়ার উপদ্রব দেখা যায়। অনেকে ভেবে থাকেন পিঁপড়া মিলিবাগ খেয়ে ফেলে । কিন্তু আসল ঘটনা হলো- মিলিবাগ এক ধরনের মিষ্টি জাতীয় তরল নিঃসৃত করে যা হানিডিউ নামে পরিচিত । এই হানিডিউ খাওয়ার জন্য পিঁপড়ার উপদ্রব দেখা যায়। অর্থাৎ পিঁপড়া মিলিবাগ খেয়ে ফেলে না বরং মিলিবাগ কে অন্য পোকা-পাখির হাত থেকে রক্ষা করে। আক্রমণ অধিক মাত্রায় হলে হানিডিউ এর উপর ছত্রাক জম্ম নেয় যা গাছের ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করে । মিলিবাগ মাটির কিছু দূর নিচে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে গাছের সব অংশে ছড়িয়ে পরে ।
মিলিবাগ দমন পদ্ধতি:
মিলিবাগ অত্যন্ত নাজুক প্রকৃতির পোকা । বিভিন্ন সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করে এই পোকা দমন করা যায়। অল্প গরম পানি সজোরে স্প্রে করেও মিলিবাগ দমন করা যায়। এমনকি ১০০% কার্যকরী ভাবে দমনের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।
কিছু পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
১. হাত সাফাই – (১০০% পরিবেশ বান্ধব):
যদি আক্রমণ কম পরিমাণে হয়ে থাকে এবং বাগানে গাছের সংখ্যা কম থাকে তাহলে ব্রাশ দিয়ে সহজেই গাছ থেকে পোকা গুলো ছাড়িয়ে নিয়ে মেরে ফেলা যাবে । আক্রান্ত স্থানে ভালো করে ব্রাশ দিয়ে ঘষে পোকা গুলো ছাড়িয়ে নিতে হবে। ছোট সাইজের ব্রাশ যেমন – দাঁত মাজার ব্রাশ , রং করার ব্রাশ এগুলো ব্যবহার করতে হবে । এভাবে মিলিবাগ দমন করাকে হাত সাফাই বলা হয়।
২. তুলোতে বা ব্রাশে রাবিং অ্যালকোহল নিয়ে-
কিছু পরিমাণ তুলোতে রাবিং অ্যালকোহল নিয়ে আক্রান্ত স্থানে ও পোকার গায়ে ঘষে দিলে পোকা ধ্বংস হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় এক অনুপাত রাবিং অ্যালকোহল এর সাথে এক অনুপাত পানি মিশাতে হবে। অর্থাৎ এক ফোঁটা অ্যালকোহল নিলে তার সাথে এক ফোঁটা পানি মিশাতে হবে।
এই পদ্ধতিও যদি গাছের সংখ্যা কম হয় তাহলেই প্রয়োগ যোগ্য । অনেক বড় বাগানের জন্য বা অনেক বেশি গাছের জন্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না।
(রাবিং অ্যালকোহল ওষুধ এর দোকানে পাওয়া যায়, রাবিং অ্যালকোহল সাধারণত হাত বা দেহের বাইরের কোনো অংশ জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহার করা হয় ।)
৩. লিকুইড সাবান ও পানি প্রয়োগ-
এই প্রক্রিয়ায় এক টেবিল চামচ লিকুইড সাবান বা ডিটারজেন্ট এর সাথে এক লিটার পানি মিশাতে হবে। মিশ্রণ পুরো গাছে স্প্রে করে দিতে হবে এবং আক্রান্ত স্থানে সজোরে স্প্রে করতে হবে । এই মিশ্রণ সপ্তাহে ১-২ বার করে স্প্রে করতে হবে । এই প্রক্রিয়ায় আক্রমণের হার কিছুটা কমলেও পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
এটি তেমন কোন কার্যকরী পদ্ধতি নয় কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে এটিকে কার্যকরী পদ্ধতি বলে ফলাও করে প্রচার করা হয়।
৪. নিম তেল প্রয়োগ-
নিম তেল প্রয়োগ করে এর আক্রমণ কিছুটা কমানো যায়। অধিক ফলাফল এর জন্য প্রত্যেক লিটার পানি+নিম তেল মিশ্রণে কিছু পরিমাণ ডিস লিকুইড সোপ/লিকুইড সোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। নিম তেল নিয়মিত স্প্রে করলে এই পোকার আক্রমণ দমন করা যায়। তবে, মনে রাখতে হবে নিম তেল সরাসরি পোকা দমন করে না । নিম তেল পোকার জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে ফলে , ধীরে ধীরে পোকার আক্রমণ হ্রাস পায় । নিয়মিত নিম তেল ব্যবহারে পোকা একসময় সম্পূর্ণ রূপে দমন হয় । কিন্তু , আক্রমণ প্রকট আকার ধারণ করলে নিম তেল ব্যবহারে তেমন কাজ হয় না । এই অবস্থায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে তা না হলে গাছ মারাও যেতে পারে।
৫. কীটনাশক প্রয়োগ-
অন্যান্য প্রক্রিয়ায় মিলিবাগ কিছু সময়ের জন্য দমন করা গেলেও দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি দমন করতে হলে অবশ্যই রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের নীতিমালা ও সতর্কতা অবলম্বন অব্যষই করতে হবে।
মিলিবাগ কার্যকরী ভাবে দমনের জন্য কিছু কীটনাশক রয়েছে । এগুলো ১৫ দিন পর পর বা কীটনাশক এর বোতলের গায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী স্প্রে করলে পোকা সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হবে । কীটনাশক পাতার উভয় পাশে এবং সম্পূর্ণ গাছে ভালো করে স্প্রে করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য কীটনাশক –
নাইট্রো– (ক্লোরপাইরিফস+সাইপারমেথ্রিন ) এবং সবিক্রন-(প্রোফেনফোস কিউ+সাইপারমেথ্রিন)
কীটনাশক প্রয়োগে ১০০% কার্যকরী ভাবে দমন করা যাবে।
ভারতে যে নামে কীটনাশক পাওয়া যায় –
Profex super (প্রোফেনফোস+সাইপারমেথ্রিন) এবং Monophos ( Monocrotophos ).
কিছু পূর্ববর্তী কাজ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
১. এপ্রিল থেকে জুন মাসের দিকে পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা গাছের গোড়ায় মাটির নিচে ডিম পাড়ে। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় । এই বাচ্চা ফুটার সময় কালে গাছের গোড়ায় মাটি নিয়মিত আলগা করে দিলে ডিম গুলো মাটির উপরে চলে আসবে এবং রোদের সংস্পর্শে আশা মাত্রই ডিম নষ্ট হয়ে যাবে ।
২. বাচ্চা ফুটার সয়মকালে গাছের গোড়ার চার পাশে পিচ্ছিল প্লাস্টিক জাতীয় ব্যান্ড লাগিয়ে দিলে ছোট বাচ্চা গাছের উপরে উঠতে পারবে না । ব্যান্ড দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে মাটিতে পরে পোকা গুলো মারা যাবে।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর -(FAQ)
১. মিলিবাগ গাছ মেরে ফেলতে পারে ?
উত্তর- আক্রমণ বেশি হলে ছোট সাইজের চারা গাছ মেরে ফেলতে পারে। তবে অনেক দীর্ঘ সময় লাগে । এমনিতে মিলিবাগ এর আক্রমণে পাতা,কান্ড হলুদ হয়ে যায় এবং পাতা ঝরে পরে।
২. মিলিবাগ কোথা থেকে আসে ?
উত্তর- মিলিবাগ মাটির কিছু নিচে ডিম পাড়ে।তাই, ডিমসহ মাটি নিয়ে আসলে মিলিবাগ ছড়ায় । ফসলের মাঠ থেকে আক্রান্ত ফল,পাতার মাধ্যমে ছড়ায় । পিঁপড়ার মাধ্যমে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছড়ায় ।
৩. মিলিবাগ মানুষের জন্য ক্ষতিকারক?
উত্তর – মিলিবাগ মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে না। তারা শুধু গাছ থেকে রস চুষে খায়।
৪. ১০০% মিলিবাগ ধ্বংস করা সম্ভব?
উত্তর – হ্যা , কীটনাশক প্রয়োগে ধ্বংস করা সম্ভব। এমনকি তাৎক্ষণিক ভাবে ধ্বংস করা সম্ভব।
৫. সাবান পানি মিলিবাগ কতটুকু দমন করতে পারে?
উত্তর – পুরোপুরি দমন করতে পারে না। খুব অল্প সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে রাখে । কিছু দিন পর আবার মিলিবাগ চলে আসে ।
পরিশেষে, যারা সম্পূর্ণ জৈব উপায়ে চাষাবাদ করতে চান তারা রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে নিম তেল ব্যবহার সহ একাধিক অন্যান্য দমন ব্যবস্থা গুলো একসাথে গ্রহণ করবেন। এতে আপনার পরিশ্রম বেড়ে গেলেও বিষ বিহীন ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।
আর যারা পরিশ্রম করতে চান না তাদের জন্য মিলিবাগ দমন এর জন্য বেস্ট হলো কীটনাশক ব্যবহার করা, এক-দুই বার কীটনাশক প্রয়োগ করলেই ১০০% দমন হবে ।
